গ্রীষ্মের তপ্তদাহে তৃষ্ণার্ত কাক এদিক ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিলো একটু পানি পান করার চেষ্টায়। দূরে তক্ষুনি চোখে পড়লো একটি কলসি। পানি খাওয়ার আনন্দে কাকটি আত্মহারা হয়ে কলসিটির সামনে উড়ে বসে পড়লো৷এবার সে ওখানে বসে কলসির ভেতরে তাকিয়ে দেখল পানি একেবারে কলসির নিচের তলায় রয়েছে। ওখানে বসেই ভাবতে সে লাগল, কি করলে কলসির ভেতর থেকে ওই জল খাওয়া যাবে………….
বইটিতে লেখক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক শিক্ষার উপর গুরাত্বরোপ করেছেন।প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মূলত চিন্তাধারণা তৈরী করতে সাহায্য করে কিন্তু সত্যিকার অর্থে, আর্থিক শিক্ষা না থাকলে একজন মানুষ সারাজীবন অন্যের উপর নির্ভর হয়ে জীবন অতিবাহিত করবে। তার জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অন্য মানুষ ধনী হবে, কিন্তু সে নিজে ধনী হতে পারবে না।
এবং এই অর্থনেতিক শিক্ষার ভিত্তি পরিবার থেকে শুরু হওয়া উচিত বলে মনে করেন লেখক।
রিচ ড্যাড ও পুওর ড্যাড বইটিতে লেখক এরূপই পাওয়া ছয়টি শিক্ষার কথা তুলে ধরেন যা তিনি তার দুই বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন।
আমাদের অধিকাংশ ভাবনা এই যে, ধনীরা শুধু টাকা ইনকাম করতে থাকে। তবে আসল বিষয়টি লেখক বৃক্ষ ও ফলের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ধনীরা একবার অর্থ আয় করে এবং সেই অর্থ এমন ভাবে ব্যবহার করে যেনো তাদের টাকার প্রবাহ চলমান থাকে। তবে, এর জন্য কিন্তু ধনীরা নতুন করে জীবিকার সন্ধান করে নাহ্।
সকল শিক্ষার আগেই আমাদের মনে একটি প্রশ্নের উদয় ঘটে, তা হলো " এটা কি প্রভাব ফেলবে? "
আমাদের জীবনে ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা প্রায়শঃ স্কুলে শিখে থাকি কিভাবে ভালো রেজাল্ট করে, একটা ভালো চাকুরী পাবো। এরপর ঐখান থেকে ধনী হওয়ার চেষ্টা করবো। আমরা সম্পদ ও দায়ের মৌলিক অর্থ অনুধাবন করতে পারি নাহ বলে অনেকক্ষেত্রেই আমরা এর প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ভুল করে থাকি। যেমন : একটি নষ্ট গাড়ি, এটি ব্যবহার করা হচ্ছে না,কিন্ত নির্ধারিত ট্যাক্স প্রদান করা হচ্ছে ।
বিপরীতে, যদি এটিকে কাজে লাগিয়ে উপার্জনের রাস্তা করা হতো এবং আয়কে কাজে লাগানো যেতো….তবে এটি নিজের জন্যই উত্তম হতো। এই গাড়িকে আমরা সম্পদ ভাবলে ও এটি সত্যিকার অর্থে দায় হিসেবে পরিগনিত হবে।
আর তাই জন্যই আমাদের অর্থনৈতিক শিক্ষা দরকার।
বছর দুয়েক আগেই, জনপ্রিয় একটি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের একটি নাট্যংশে দেখিয়েছিলো,পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি ওনি নতুন বিদেশী আনকমন শাড়ি কিনেছে, কি সুন্দর! আমি ও যদি কিনতে পারতাম?
আমরা প্রায়শই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমরা এভাবেই অন্যের সাথে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করি। ঐ ভিন্ন জিনিসের জন্য হয়তো আমরা সর্বস্ব হারাতে ও রাজি । আর এই চলমান প্রক্রিয়ার জালে আমরা জীবনের আসল আস্বাদন ভুলে যায়। তাই "Oil your own machine " বহুল প্রচলিত।
ধনী -গরিব সকলেই অর্থ আয়ের পাশাপাশি ব্যয় করে এবং এর উপর ট্যাক্স প্রদান করে। তবে এক্ষেত্রে ধনীরা একটু ধূর্ততার পরিচয় দিয়ে থাকে, যেখানে গরীবরা দোষ খুঁজতে থাকে।রবিনহুডের ঘটনা উল্লেখ করে লেখক গরিবদের গরীব থাকার কারণ আরেকবার চিহ্নিত করেছে। ব্যক্তি করের মাত্রা তুলনামূলক বেশি বিধায়, ধনীরা অর্থ ব্যয় করে করপোরেশনের নামে। এতে করে করপোরেশনের সব ব্যয় বাদ দিয়ে, বাকী অর্থের উপর কর আরোপ হয় ; যা নামমাত্র মূল্য। আর এই করপোরেশন ধনীদের সম্পদ হিসেবে ও গগনা করা হয়। আর এটাই ধনীদের পার্থক্য করে দেয়। সারা সময় কারণ খুঁজে ও কর দিয়েই যাচ্ছে গরীবরা।
আমরা বেশিরভাগ মানুষই যা ভাবি, খুব অল্প সংখ্যক তা করি। কারণ ভাবনায় আমরা এভারেস্ট শীর্ষে ছিলাম, তবে বাস্তবে এভারেস্ট অভিযানে যাওয়ার আগের ধাপ গুলো জানার পর; আমরা ঐখানেই থেকে যায়।
ঝুঁকি নেওয়ার মনোভাব পোষণ করি নাহ বলে বেশিরভাগ সময় আমরা পিছিয়ে যায়। ঠিক এই পাঠে লেখক ধনীরা চাহিদানুযায়ী ঝুঁকি সহ কাজ করে সফলতা অর্জন করেছেন বলে আজ ধনী হতে পেরেছেন বলে ব্যক্ত করেন । আর ফলাফল স্বরূপ ধনীরা ইনকাম করে যাচ্ছে এবং গরীব'রা ঋণ ভারে ন্যস্ত।
ধনীরা নানান স্তরের মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের পরিকল্পনা ও দ্রব্য তুলে ধরে ক্রয় বিক্রয় কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমবার লভ্যাংশ না আসলে ও , আসল ব্যাপার রপ্ত করে সে চাহিদানুযায়ী ও প্ল্যান মাফিক কার্যক্রম চলমান রাখে। শুরুতেই অর্থভাবনা কাজের বারবার বাঁধা বিঘ্ন ঘটায়।
চলে আসি একদম শুরুর দিকে,
"তোমাদের জন্য আমি আজ গরিব হয়ে গেছি”,
বনাম
“তোমাদের জন্য আমাকে ধনী হতে হবে”
পুরো বইতে উচ্চ শিক্ষিত পুওর ড্যাডের আত্মঙ্ক, সাহসের অভাবের অভাব, জড়তা, বদ অভ্যাস, আত্মগর্ব এসব বিষয় গুলো খুব সূক্ষ্ণভাবে লেখক উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে নিজ সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাস করা রিচ ড্যাড দেখিয়েছেন গভীর উদ্দীপনা, আত্মবিশ্বাস,অদম্য শক্তির মাধ্যমে তিনি কিভাবে ধনীদের কাতারে যুক্ত হয়েছেন।
একদম শুরুর কাকের গল্প দেখে অবাক লাগছিলো তাই না? সত্যিকার অর্থে, ঐ কাক অনেকটাই ধনীদের মতো মনোভাব দেখিয়েছে বলে ঐদিন পানি পান করতে সক্ষম হয়েছে। বুদ্ধি, ইচ্ছে, আর দৃঢ় মনোভাব আমাদের প্রতিদিন ,প্রতিটি ক্ষণে আপনাকে ধনী করে তোলে।
ঈদের সময় পাশের ফ্ল্যাটে কে কি কিনেছে এসব যদি ভাবনায় আসে, আর ভাবেন বার বার ইনস্টলমেন্ট দিয়ে আপনি ও কিনে একটু দেখিয়ে দিবেন। তবে এই আপনি জালে আটকে পড়ে গেছেন…
বইটি আসলে জীবনের চলমান চিরাচরিত দৌড়ের শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে এসে, অদম্য ইচ্ছে শক্তির মাধ্যমে একান্ত অধ্যাবসায়, নিয়মানুবর্তিতা, ও সময়কে কাজে লাগিয়ে উদ্দেশ্য সফল করার কথা ব্যক্ত করছে।


.png)
No comments:
Post a Comment