কবি নির্মলেন্দু গুণ 'স্ববিরোধী' কবিতায় বলেছিলেন,
“আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম,
এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি”
উক্ত কবিতার শেষ ২ লাইনের তাৎপর্যপূর্ণতা থেকে শুরু করছি "সংগঠন ও বাঙালি " প্রবন্ধটি।
বিশিষ্ট অধ্যাপক স্যার আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ ৪৩ বছর আগে বিবেকের তাড়নায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন দেশখ্যাত সংগঠন "বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র"। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠাকালে তাঁর ছিলো না কোনো পুঁথিগত ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ;শুধুমাএ ছিলো স্বপ্ন, তার বাস্তবায়ন এবং দৃঢ়চেতা মানসিকতা। একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠালগ্নে ,তার পিছনের প্রচ্ছন্ন নিয়ামক এবং পারিপার্শ্বিক সকল বিষয় লেখক তুলে ধরেছেন "সংগঠন ও বাঙালি " বইটিতে।
শুরুতে লেখক আত্মসমালোচনায় বলেছেন, তিনি অলস প্রকৃতির মানুষ, এবং নিজ কাজে উদাসীন।বয়স আঠোরো হওয়ার পূর্বেই তিনি চিন্তা করতেন, তার বয়সে তিনি যা করতে ব্যর্থ, সে একই বয়সে অনেকেই রাজ্য জয়,যুদ্ধের মতো কঠিন কার্য সম্পন্ন করেছেন।সেখানে, তিনি কবিতার পঙক্তি কিংবা বন্ধুবান্ধবে মশগুল।দায়িত্ব নিতে অপারগ তিনি কারণ অন্তগর্ত ভয়।কলেজ জীবনের একটি ঘটনায় স্বীকার করেন, কাজটি ছোট বা বড়ো যায় হোক,কাজ করার পূর্বেই ভয় থেকে কান্নার মাধ্যমে পলায়ন করতেন কাজটি থেকে। তার আত্মব্যক্ততার মাঝেই তিনি বাঙ্গালির সাংগঠনিক দুর্বলতা গুলো প্রকাশ করেছেন। বাঙালির ইতিহাস থেকে লক্ষ্যনীয়, বরাবরই পরাধীন হয়ে নিজ ভূখণ্ড বাস করে এসেছে বাঙ্গালী, কারণ জাতির সংগাঠনিক বিকাশ হয় নি বা সংগঠন ছিলো নাহ্।পরাভূত থাকার সময়কালে শাসক কখনোই বাঙ্গালীর সমস্যাগুলো দূর করতে পারি নি, বাস্তবতার কারণে।৭১ পরবর্তীতে প্রয়োজনের তাগিদে অনেক সংগঠন গড়ে ওঠার বিষয় টি অত্যন্ত আনন্দের সাথে লেখায় প্রকাশ করেছেন। লেখক যুগের দাবী পূরণ করতে, নিজ হতে উদ্যত হয়ে অনেক প্রিয় কাজ পরিত্যাগ করে সংগঠন গড়ে তুলেছেন, এবং বড়ো প্রতিষ্ঠানের দুঃখ নিয়ে কিন্তু একই ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ে বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের কর্মনুপ্রেরণায় তিনি কাজটি সম্পন্ন করেছেন। তার মতে,জাতি হলো বহু সংগঠনের যোগফল।একাওর পূর্ব সময়ে সাংগঠনিক বিকাশ হয়নি বলে সাংগঠনিক প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধিতা লেখক লেখার মাধ্যমে, শিক্ষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তবে নিঃস্ব পরিবেশের শিক্ষক হয়ে গতানুগতিক ধারা ভাঙতে পারেন নি।লেখকের মতে,সংগঠন হলো একটি লক্ষ্য অর্জনের জন্য যখন কিছু ব্যক্তি একত্রিত হয় এবং ধারাবাহিকভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে। হেনরী ফোর্ডের মোটর গাড়ির উদাহরণ দিয়ে লেখক সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি যুগের উন্নতিতে ভূমিকা রাখার বিষয়টি আলোকপাত করেছেন।সংগঠন সফল হওয়ার কিছু বিষয় তিনি উল্লেখ করেছেন,সেগুলো হলো :
⚫উজ্জ্বল ও অর্থপূর্ণ লক্ষ্য;
⚫স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বপ্নময় উদ্যেগ ;
⚫তা সক্রিয় করে বস্তুগত চেষ্টা এবং
⚫আর্থিক অবস্থার লাভ উচিয়ে ধরার মাঝে ব্যক্তিদের অনুপ্রেরণা দেওয়া।
লেখক লতার পঙক্তিগুলোর মধ্যে দিয়ে দল ও সংগঠনের মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরেছেন,পাশাপাশি দলের সুবিন্যস্ত নেতৃত্ব সংগঠন তৈরির ক্ষেত্রে কাজ করে।
বাঙালি একক কাজে পারদর্শী এটা আমাদের চারিএিক বৈশিষ্ট্য।ব্যক্তিস্বার্থকে বৃহৎ রেখে,কেন্দ্র স্বার্থকে ক্ষুদ্র করে আত্মকেন্দ্রীক "কেবল আমি ও আমার" রূপায়িত হয় বাঙালি জাতির মাঝে।লেখক নিজ সংগঠন তৈরির সময় এসব বিষয় লক্ষ্য করেছেন।
বাঙ্গালির হীনতা ও শঠতা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইংরেজরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শিক্ষক সমতুল্য গুরুজনের "বিড়ির গল্প "মূলত বাঙালির ভালো কাজের মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতাকে বুঝিয়েছেন।সমাজে মূল্যবোধের দুঃখজনক বিকৃতির পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে ঘুষের ছড়িয়ে পড়া উদ্যেম ও বেপরোয়াভাবে, সর্বগ্রাসী দুনীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থলিপ্সায় বাধ্যর্ক্য ও তুচ্ছতা বড্ড বেশি পীড়াদায়ক।
আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতাকে থমকে দে সমষ্টিগত বিকাশ।আত্মপরাতাই হলো দুনীর্তি।লেখক গ্রামের ঐ অল্প শিক্ষিত ও স্বপ্নবাজ ব্যক্তিটির উদাহরণ টেনে বাঙ্গালির স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য উচ্চাকাঙ্খা ও বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে নিজেকে জাহির করার ঘৃণ্য আস্ফালনে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।বারংবার ইতিহাসের পর্যালোচনায়,এদেশীয় একমুখী চিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি,পরচর্চা বৈশিষ্ট্য বিস্তার বর্ননা করেছেন।বাঙালির ব্যক্তিগত অসহায়তা, অক্ষমতা পরোক্ষভাবে সংগঠন গঠনে প্রভাব ফেলে। দারিদ্র্যতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ পরাজিত ব্যক্তি সকল কর্মে নিজেকে প্রথম স্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার দৌড়ে পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের অনুপুঙ্খ করেন।প্রথম হওয়ার প্রচেষ্টায় তারা আপন ঘর ভেঙে অপরের মনোবল বিনষ্ট করে।
বাঙ্গালী জাতির এক অবিশ্বাস্য গুন তারা একা একা নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম হলে ও ; সম্মিলিত প্রয়াসে একই প্রতিযোগিতায় নৌকা ডুবিয়ে আত্মহনন করেন।
বাঙালি কর্মের ফলাফল কর্ম শেষ হওয়ার আগেই উদযাপনের দুর্বল মানসিকতায় ফলস্বরূপ পরাজয় গ্লানি বরণ করে।প্রচন্ড আলোস্যের কারণে নাগরিক জীবনের ছোটো কাজের জন্য কেন্দ্রের অপেক্ষায় প্রহর গুনি।নিজেরা সমস্যা সমাধানের উপায় জেনে এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আত্মহনন করি। বাঙালির ইতিহাসের কথা এবং বাস্তব জীবনের উদাহরণ, উন্নত সাহিত্য ও সাহিত্যিক কথা বারবার উল্লেখ করেছেন।সৃষ্টিকর্তা আমাদের আবহাওয়া, ভূমি ও অন্য সব কিছু দেওয়া স্বও্বেও আমরা তার যর্থাথ ব্যবহার করতে পারি নি কারণ বাঙালি স্বাস্থ্যে মজবুত নয় প্রাকৃতিক ভাবে। অভিযোজন সক্ষমতা দুর্বল এবং জানার মাত্রা কম থাকায় যারা এই বিষয়ে জ্ঞান রাখে তাদের বলি স্থূল এবং তার পরামর্শকে বলি অভূর্তপূর্ব কাজ।পারিবারিক রাজনৈতিক শৃঙ্খল সরকারের অধিনস্ত বলে,সব বুঝে ও মৌন থাকা আমাদের ধাতের মধ্যে পড়ে।আমরা পদবী ও পদের মোহে, পদ রক্ষা করার উপায় কখনোই চিন্তা করি নাহ এবং পরনির্ভরশীল হয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করি।আমরা কষ্ট করার চেয়ে ফলাফল উপভোগ করার মানসিকতায় বেশি আগ্রহী। সংগঠনে ভালো কাজ যিনি করেন, তার মধ্যে বিরাজমান মানসিকতা,বিচক্ষণতায় পরবর্তী সংগঠন দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে।বাঙ্গালী জাতি ভালো কাজকর্ম ও তার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আক্রমণ করার পদ্ধতির মাধ্যমে একটি সংগঠন নষ্ট করে।
লেখক পুরো পুস্তকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বাঙালির আত্ম-চরিত্র ও তা থেকে উওরণের পথ নিয়ে কথা বলেছেন। ছোট ছোট উদাহরণের মাধ্যমে জাতীয় জীবনে পিছিয়ে পড়ার কারণ বলেছেন। পাশ্চাত্য দেশের ভূয়সী প্রশংসার অব্যক্তে বাঙ্গালী জাতির "জাতীয় পরিপাশ্বিক পরিবর্তন " নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে এই স্বপ্ন ও আশা প্রবলভাবে ধারণ করছেন।


.png)
No comments:
Post a Comment